অর্থকারী ফসল

পাট চাষাবাদ

পাট চাষাবাদ

পাট পরিচিতিঃ-
দুই ধরনের পাট বাংলাদেশে দেখতে পাওয়া যায়: Corchorus capsularis (সাদা পাট) ও Corchorus olitorius (তোষা পাট)। এটি Tiliaceae পরিবারের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ। মনে করা হয় সংস্কৃত শব্দ পট্ট থেকে পাট শব্দের উদ্ভব হয়েছে। পাটের ইংরেজি নাম জুট (Jute )। সম্ভবতঃ উড়ে (উড়িষ্যা, ভারত) ভাষা থেকে এসেছে।

পাঠ পরিচিতির মাধ্যমে জাত ও বীজ নির্বাচন করে অংকুরোদগম পরিক্ষার মাধ্যমে জমি নির্বাচন ও বপন ও উৎপাদনের জন্য সাথী ফসলের শাকসবজি ও পাতলাকরনের জন্য সার প্রয়োগ করে কর্তনের সাহায্য পচন প্রক্রিয়ায় ফসল সংগ্রহ করা।
পাটের জাত নির্বাচনঃ-
আঁশ ফসলের জন্য চার ধরনের পাট রয়েছে। দেশী পাট, তোষা পাট, কেনাফ ও মেস্তা পাট। দেশী পাটের মধ্যে রয়েছে বিজেআরআই দেশী পাট -৫, ৬, ৭ এবং বিনা দেশী পাট-২ উল্লেখযোগ্য। তোষা পাটের মধ্যে ও-৯৮৯৭, ওএম-১ উল্লেখযোগ্য।
পাটের জিন রহস্য আবিষ্কার করার পর বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন জাতের পাট রবি-১ উদ্ভাবন করেছে। রবি-১ নামে নতুন জাতের এই পাট বিঘায় ১০ মণ করে ফলন দিবে। তোষা-মেস্তা পাটে ফলন হয় গড়ে ৭/৮ মণ হারে। নতুন জাতের এই পাটের আবাদের খরচ তোষা-মেস্তা পাটের মতোই। বয়স ১০০ দিন হলেই জমি থেকে পাট কাটতে পারবে কৃষকরা। এছাড়া এই পাট কাটার পরই কৃষকরা ওই জমিতে রোপা আমন ধান আবাদ করতে পারবে।

বীজ নির্বাচনঃ-
অধিক ফসল পাওয়ার জন্য রোগমুক্ত, পুষ্ট এবং ভাল মানের বীজ ব্যবহার করতে হবে। নিম্ন মানের বীজ ব্যবহার করলে ফলন ভাল পাওয়া যায় না।

বীজের অংকুরোদগম পরীক্ষাঃ-

মাটির সানকি, চোষ কাগজ বা নরম কাপড়ের উপর ১০০ টি বীজ গজিয়ে পরীক্ষা করে নিলে ভাল হয়। এতে মাত্র ৩ দিন লাগবে। আশিটির বেশি বীজ গজালে বুঝতে হবে তা ভাল বীজ।

নিড়ানী ও পাতলাকরণঃ-

৭০-৯০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় বার পাট গাছ পাতলা করতে হয়। দ্বিতীয় বার যে চারা পাতলা করা হয়, সেই চারাগাছ না ফেলে দিয়ে পঁচিয়ে আশ করা হলে উন্নতমানের আঁশ পাওয়া যায়। বীজ বপনের সময় পরিমিত হারে বীজ বপন করলে পাতলাকরণের সময় কম চারা উঠালেই কাজ হবে।

পাট বীজ উৎপাদন পদ্ধতিঃ-
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে তিন পদ্ধতিতে পাট বীজ উৎপাদন করা যায়। পদ্ধতিগুলো হলো-
ক) সরাসরি বীজ বপণ পদ্ধতি,
খ) কান্ড ও ডগা রোপণ পদ্ধতি এবং
গ) চারা রোপণ পদ্ধতি।
এদের মধ্যে সরাসরি বীজ বপন পদ্ধতি এবং কান্ড ও ডগা রোপণ পদ্ধতি দুটিই পাট বীজের সাথে সাথী ফসল হিসেবে সবজি উৎপাদন এর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী।


কৃষি২৪
সরাসরি বীজ বপন পদ্ধতিঃ-
এ পদ্ধতিতে ভালো বীজ পেতে হলে দেশি পাট বীজ শ্রাবণ মাস অর্থাৎ মধ্য জুলাই থেকে মধ্য আগস্ট এবং তোষা পাটের বীজ ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি অর্থাৎ ৩০ আগস্ট এর মধ্যে বপন করতে হবে। সারিতে বপন করলে প্রতি শতাংশ জমিতে ১৬ গ্রাম তোষা এবং ২০ গ্রাম দেশি বীজ বপন করতে হবে। আর ছিটিয়ে বপন করলে শতাংশে ২০ গ্রাম তোষা এবং ২৪ গ্রাম দেশি পাটের বীজ বপন করতে হবে।

কাণ্ড ও ডগা রোপণ পদ্ধতিঃ-
কৃষকের হাতে নাবীতে বপনের জন্য যখন কোন বীজ না থাকে সে বছর আঁশ ফসল থেকে বেছে কাণ্ড ও ডগা কেটে নিয়ে বীজ উৎপাদন করা যায়। আঁশ ফসলের জমি থেকে গাছের বয়স ১০০ দিনের মতো হলে সুস্থ সবল গাছ বেছে নিতে হবে। বাছাই করা গাছের কাণ্ড ও ডগাগুলো ধারালো চাকু, ব্লেড বা বঁটির সাহায্যে কাটতে হবে যাতে প্রতিটি টুকরার দৈর্ঘ্য ২০-২৫ সেমি. বা ৮-১০ ইঞ্চি হয় অর্থাৎ প্রতি খণ্ডে কমপক্ষে ২-৩টি পর্ব বা গিট থাকে। টুকরাগুলো গোড়ার দিকে তেরছা করে কাটতে হবে যাতে বাকল থেঁতলে না যায়। টুকরার তেরছা অংশ যেদিন ডগা সংগ্রহ করা হবে সে দিনই রোপণ করা ভালো। তবে মেঘলা দিনে বা পড়ন্ত রোদে ডগা রোপণ করা উত্তম। দেড় ফুট দূরত্বে উত্তর-দক্ষিণে সারি করে এবং উত্তর দিকে ৪৫ ডিগ্রি কাত করে সেই টুকরাগুলো রোপণ করতে হবে। অতঃপর যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে উভয় পদ্ধতির বীজ যথাসময়ে সংগ্রহ করতে হবে।

পাট বীজের সাথে সাথী ফসল হিসেবে সবজি উৎপাদনঃ-

পাট বীজ সাথে লালশাক, পুঁইশাক, বাটিশাক, চীনাশাক, মূলা, গাজর, ঢেঁড়স, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, পালংশাক, মরিচ, টমেটো জাতীয় বিভিন্ন রবি ফসলের সাথে বা ক্ষেতের আইলে অথবা নতুন সুপারির বাগান বা আম, লিচু এ জাতীয় বিভিন্ন নতুন বাগানে সাথী ফসল হিসেবে উৎপাদন করা যায়। এই সমস্ত ফসল সারিতে বপন বা রোপণ করে দুটি সারির মাঝখানে সারি করে পাট বীজ বপন করতে হবে।

নাবী পদ্ধতিতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে পাট বীজ উৎপাদনের জন্য সময় লাগে প্রায় ১২০ দিন। তবে আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে এই সময় কম বেশি হতে পারে। লালশাক, বাটিশাক, চীনাশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, পালংশাক, পুঁইশাক ইত্যাদি ফসল আলাদাভাবে প্রয়োজনীয় দূরত্বে সারি করে বীজ বপন করতে হবে এবং সারির মাঝ দিয়ে আবার সারিতে সরাসরি পাট বীজ বপন করে অথবা কা- বা ডগা রোপণ করে পাটবীজ উৎপাদন করা যাবে। পাট বীজ সংগ্রহ করার আগেই এই সমস্ত শাক সংগ্রহ করে খাওয়া বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। আবার পাট বীজ সংগ্রহ করার কিছু আগেই সেই জমিতে সারিতে ঢেঁড়স এর বীজ গর্ত করে লাগানো যাবে, পাট বীজ সংগ্রহ করার পর সেই ঢেঁড়স গাছ বড় হয়ে পরবর্তীতে ফলবান হবে। একই ভাবে টমেটো বা এ জাতীয় অন্যান্য ফসলও চাষ করা যাবে।

পাট বীজ ফসলের সাথে শাকসবজি চাষ পদ্ধতিঃ-
রবি মৌসুমেও বীজ ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে শাকসবজি চাষ করা যায়। একই জমিতে পাট বীজ ফসলের সাথে শাকসবজি চাষ করে কৃষকের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও পাটের চাহিদা মেটানো যায়। এতে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা যায়। শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি (আগস্টের প্রথম) থেকে পুরো ভাদ্র মাস চাষ (১৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত উঁচু জমিতে এ পদ্ধতি ব্যবহার উপযোগী।

শীতকালে অর্থাৎ রবি মৌসুমে আগাম শাকসবজির (লালশাক, মুলা, পালংশাক, টমেটো, বেগুন ইত্যাদি) সাথে জমিতে পাট বীজ একই সাথে সারিতে চাষ করা যায়।
শতাংশ প্রতি ২ কেজি জৈবসার বীজ বপনের ২০-২১ দিন আগে প্রথম চাষের সময় প্রয়োগ করে ভালো ভাবে জমি চাষ করতে হবে। জমির শেষ চাষের সময় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়।

শতাংশ প্রতি ইউরিয়া ৯০০ গ্রাম, টিএসপি ৬০০ গ্রাম, এমওপি ৩৭৫ গ্রাম, জিপসাম ৬০০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইউরিয়া (অর্থাৎ অর্ধেক ইউরিয়া), টিএসপি, এমপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষে প্রয়োগ করে মই দিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয় কিস্তির ইউরিয়া সার বীজ বপনের ২০-২৫ দিন পর লালশাক সম্পূর্ণভাবে তুলে এবং আগাছা তুলে জমিতে উপরিপ্রয়োগের সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ রস থাকে।
প্রথমে ক্ষেতের চার পাশে মুলা/পালংশাকের বীজ ক্ষেতের সীমানা থেকে ১০ সেমি. ভেতরে লাইনে বপন করতে হবে। তারপর মূলা/পালং শাকের ১৫ সেমি. ভেতরে প্রথমে দুই লাইন পাট এরপর দুই লাইন সবজি এবং প্রতি দুই লাইন ফসলের মাঝে এক লাইন করে লালশাক বপন করতে হবে।

এ ছাড়া উপযুক্ত সময়ের সাথে সমন্বয় করে মুলা, গাজর, মরিচ এর বিভিন্ন জাতের বীজ সারিতে বপন করে সারির মাঝ দিয়ে পাট বীজ বপন করা যাবে। এ প্রক্রিয়ায় ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, জমি যেন সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। পোকামাকড়, রোগজীবাণু থেকে ফসলকে মুক্ত রাখার জন্য সঠিকভাবে আন্তঃপরিচর্যা ও আগাছা দমন করতে হবে।

আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়ার জন্য কোন জমিতে শুধু পাট বীজ উৎপাদন না করে এর সাথে সাথী ফসল হিসেবে এক বা একাধিক শাক বা সবজি জাতীয় ফসল উৎপাদন করে অনেক বেশি লাভবান হওয়া যায়।

রিবণ রেটিং পদ্ধতিতে আঁশ ছাড়ানোঃ-

এ পদ্ধতিতে বাঁশের হুক বা রিবনের সাহায্যে কাঁচা পাট গাছ থেকে ছাল পৃথক করা হয়।

ছাল পচানো, আঁশ ধোয়া এবং আঁশ শুকানোর পদ্ধতিঃ-

(ক) বড় মাটির চাড়িতে কাঁচা ছালগুলোকে গোলাকার মোড়া বেঁধে সাজিয়ে রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে চাড়িটি ভরে দিতে হবে। একটি বড় চাড়িতে প্রায় ৩০ কেজি কাঁচা ছাল পচানো যায়।

(খ) যদি আশেপাশে ছোট ডোবা বা পুকুর বা খাল বা কম গভীরতা সম্পন্ন জলাশয় থাকে তবে ছালগুলোকে গোলাকৃতি মোড়া বেঁধে একটা লম্বা বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে পচানো যাবে।

(গ) বাড়ীর আশেপাশে অথবা ক্ষেতের পাশে ১৫-১৬ ফুট লম্বা, ৬-৮ ফুট প্রস্থ এবং ২ ফুট গভীর গর্ত খুড়ে গর্তের তলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে উক্ত গর্ত পরিষ্কার পানি দিয়ে ভরে সেখানে ছালগুলো পচানো যেতে পারে। সম্ভব হলে ছালের মোড়াগুলো কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দেয়া যেতে পারে। গর্তে কিছুটা পাট পচন পানি অথবা ইউরিয়া সার মিশিয়ে দিলে পাট পচন তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয়। এতে ৭-৮ দিনের মধ্যে ছালগুলো পচে যায়।

(ঘ) আঁশগুলো পচে গেলে আগের নিয়ম অনুযায়ী বাঁশের আড়ায়, ঘরের চালে অথবা ব্রিজের রেলিং এর উপর শুকাতে হবে।

পাট পচন প্রক্রিয়াঃ-

(ক) বাছাইকরণঃ-

পাটের জমিতে ছোট, বড়, চিকন, মোটা নানা জাতের পাট গাছ হয়। পাট গাছ কাটার পর চিকন ও মোটা গাছকে পৃথক করে আটি বাধতে হবে। এবং আটির ওজন ১০ কেজির বেশী হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। চিকন ও মোটা পাটের গাছগুলোকে আলাদাভাবে জাঁক দিতে হবে। পাটের আটি কখনও শক্তভাবে বাধা যাবেনা তাতে পচনকারী জীবানু ব্যাকটেরিয়াগুলি ভালভাবে প্রবেশ না করার কারণে পাট পচনে অনেক সময় লাগে।

(খ) পাতা ঝরানোঃ-

আটি বাধা শেষ হলে সেগুলিকে জমির উপর ৩-৪ দিন জমির উপর স্তুপ করে রাখুন। এই সময়ের মধ্যে গাছের পাতাগুলি ঝরে যাবে এবং গাছগুলি কিছুটা শুকিয়ে যাবে। পাতাগুলি জমির উপর ছড়িয়ে দিলে ভাল সার হবে। গাছ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে পানিতে ফেললে তাড়াতাড়ি গাছের ভিতরে পানি প্রবেশ করবে। পাট কাটার সময় জমিতে পানি থাকলে পাতা না ঝরিয়ে সরাসরি পচানো যেতে পারে।

(গ) গোড়া ডুবান বা গোড়া থেতলানোঃ-

পাতা ঝরানোর পর পাট গাছের গোড়া (১) পাট গাছের গোড়ার অংশ দেড়ফুট পরিমান ৩/৪ দিন পানির নিচে ডুবিয়ে রাখুন, তাতে করে গোড়া নরম হবে তারপর আটি পানিতে ডুবিয়ে দিন (২) অথবা গাছের গোড়ার দেড়ফুট পরিমান একটি হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আশ নরম করে পানিতে আটি ডুবিয়ে দিন। কিন্ত দুইরকম কাজ একসাথে করা যাবেনা।

(ঘ) জাক তৈরী ও ইউরিয়া সার ব্যবহারঃ-

জাক তৈরির সময় পাটের আটিগুলিকে প্রথম সারিতে লম্বালম্বিভাবে, দ্বিতীয় সারিতে আড়াআড়িভাবে, তৃতীয় সারিতে আবার লম্বালম্বিভাবে এভাবে জাক তৈরী করলে পানি এবং পচন জীবানু জাকের মধ্যে সহজে চলাফেরা করতে পারে। পচনক্রিয়া দ্রুত সম্পাদনের জন্য প্রতি ১০০০ আটি পাটের জন্য ১ (এক) কেজি ইউরিয়া সার পাটের আটির উপর ছিটিয়ে দিতে হবে, কিংবা ইউরিয়া সার একটি পাত্রে গুলে পাট পচানোর পানিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

(ঙ) পচন নির্ণয়ঃ-

পাট বেশী পচলে আঁশের শক্তি কম হয় আর কম পচলে আঁশের সঙ্গে গাছের ছাল লেগে থাকে, এজন্য পরিমিত পচনকাল নির্ণয় করা জরুরী। জাক দেবার ৮-১০ দিন পর ২/৩ টি পচা পাট জাক থেকে বের করে পচা পাটের মধ্যাংশ থেকে ১ ইঞ্চি পরিমাণ ছাল কেটে ছোট শিশির ভিতর পানি দিয়ে ঝাকানোর পর শিশির পানি ফেলে আবার পরিষ্কার পানি দিয়ে ঝাঁকিয়ে যদি দেখা যায় যে, আঁশগুলো পরষ্পর পৃথক হয়ে গেছে তখন বুঝতে হবে যে পচন শেষ হয়েছে। মনে রাখবেন বেশী পচনের চেয়ে একটু কম পচনই ভাল।

(চ) আঁশ ছাড়ানো প্রক্রিয়াঃ-

পচন শেষ হলে পাট গাছ থেকে দুই প্রকারে আঁশ ছাড়ানো যেতে পারে (১) শুকনা জায়গায় বসে একটা একটা করে আঁশ ছাড়ানো যেতে পারে, অথবা (২) পানির মধ্যে দাড়িয়ে বাঁশের আড়ার সাহায্যে একসঙ্গে অনেকগুলো পাটের আঁশ ছাড়ানো যেতে পারে। আঁশ ছাড়ানোর সময় গাছের গোড়ার শক্ত অংশ শক্ত কাঠ বা বাঁশ দিয়ে থেতলে নিলে আঁশ ছাড়ানোর কাজ অনেক সহজ হয়।

(ছ) আঁশ ছাড়ানোর পরঃ-

আঁশগুলোকে পরিষ্কার পানিতে ধোয়া উচিত। ধোয়ার সময় আঁশের গোড়া সমান করে নিতে হবে। এমনভাবে আঁশ ধুতে হবে যেন কোন প্রকার পচা ছাল, ভাঙ্গা পাট খড়ি, অন্য কোন রকম ময়লা, কাদা ইত্যাদি আঁশের গায়ে লেগে না থাকে। কারণ এতে পাটের মান নষ্ট হয় এবং বাজারে এ সকল আঁশের চাহিদাও কমে যায়।

(জ) আঁশ শুকানোঃ-

আঁশ ধোয়ার পর খুব ভাল করে আঁশ শুকানো উচিত। আঁশ কখনও মাটির উপর ছড়িয়ে শুকানো উচিত নয়, কারণ তাতে আঁশে ময়লা, ধুলো-বালি ইত্যাদি লেগে যায়। বাঁশের আড়ায়, ঘরের চালে, ব্রিজের রেলিং বা অন্য কোন উপায়ে ঝুলিয়ে ভালভাবে আঁশ শুকাতে হবে। ভেজা অবস্থায় আঁশ কখনই গুদামজাত করা উচিত নয়। কারণ এতে আঁশের মান নষ্ট হয়।

ফসল কর্তণ সময়ঃ-

পাটগাছে যখন ফুল আসা শুরু হয় বা ফলধারণ শুরু হয় তখনই পাটগাছ কাটা জরুরী। সাধারণত পাটগাছ ১২০ দিনের মধ্যে কাটলে ভাল মানের আঁশ পাওয়া যায় ।

উপরি ইউরিয়া সার প্রয়োগঃ-

দ্বিতীয় কিস্তি (৪৫ দিনে) ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকে। এই সময় ইউরিয়া সার শুকনা মাটির সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করা ভাল। প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সার হো যন্ত্রের সাহায্যে অথবা প্রচলিত নিড়ানীর সাহায্যে ভাল করে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সার গাছের কচি পাতায় না লাগে।

জমি নির্বাচনঃ-

দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ ধরনের যে কোন জমিতে পাট ভাল জন্মে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন জমি বৃষ্টির পানিতে ডুবে না যায় এবং অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের সুবিধা থাকে।

জমি তৈরিঃ-

পাট চাষের জন্য জমি ৫-৬ বার গভীর এবং এপাশ ওপাশ করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চাষ দেওয়া প্রয়োজন। চাষের পরে মই দিয়ে জমির মাটি মিহি করে সীড ড্রিলের সাহায্যে অথবা লাঙ্গলের ফলা দিয়ে সারি করে বীজ বপন করতে হবে।

নিড়ানী ও পাতলাকরণঃ-

পাটের জমিতে নানা ধরণের আগাছা জন্মে। এজন্য সময়মত আগাছা দমন করা প্রয়োজন। সারি করে বীজ বপন করলে হাত দিয়ে এবং ছিটিয়ে বীজ বপন করলে আঁচড়া দিয়ে চারা পাতলা করা যেতে পারে। পাট গাছের বয়স ১৫-২০ দিনের মধ্যে আগাছা দমনের সময় একবার নিড়ানী দিয়ে চারা পাতলা করা দরকার।

বীজের পরিমাণ ও গাছের ঘনত্বঃ-

কৃষকরা জমিতে ছিটিয়ে পাট বুনে থাকেন, কিন্ত এই পদ্ধতিতে জমিতে বীজের পরিমাণ বেশী লাগে এবং গাছের ঘনত্ব সমান থাকেনা। তাই লাঙ্গলের ফলা কিংবা সূচাল কাঠি দিয়ে সরু নালা করে সারিতে বীজ বুনলে বীজ কম লাগে এবং বীজ গজানোর হারও বেশী হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে আন্তঃপরিচর্যা করতে সুবিধা হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সে.মি. এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৭ সে.মি হলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। সারিতে বীজ বপনের জন্য বীজ বপন যন্ত্র বা সীডার ব্যবহার লাভজনক। এক শতাংশ জমিতে পাটের জন্য ২০ গ্রাম হারে বীজ প্রয়োজন।

সারের পরিমাণ ও সার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ-

প্রতি শতাংশ জমিতে নিম্মমাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।

প্রয়োগের সময় সারের নাম সারের পরিমাণ
১.শুকনা গোবর সার বীজ বপনের ২/৩ সপ্তাহ পূর্বে ২০ কেজি
২.ইউরিয়া বীজ বপনের দিন ৪০০ গ্রাম
বীজ বপনের ৪৫ দিন পর ৪০০ গ্রাম
৩.টিএসপি বীজ বপনের দিন ২০০ গ্রাম
৪.এমপি বীজ বপনের দিন ২৪০ গ্রাম
৫.জিপসাম (জমিতে গন্ধকের অভাব দেখা দিলে) বীজ বপনের দিন ৪০০ গ্রাম
৬.জিঙ্ক সালফেট (জমিতে দস্তার অভাব দেখা দিলে) বীজ বপনের দিন ৫০ গ্রামসার প্রয়োগ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুনঃ

প্রয়োগকৃত গোবর সার চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি, জিপসাম এবং জিঙ্ক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষে প্রয়োগ করে মই দিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
দ্বিতীয় কিস্তি (৪৫ দিনে) ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকে। এই সময় ইউরিয়া সার শুকনা মাটির সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করা ভাল। প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সার হো যন্ত্রের সাহায্যে অথবা প্রচলিত নিড়ানীর সাহায্যে ভাল করে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সার গাছের কচি পাতায় না লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button