অর্থকারী ফসল

পান চাষাবাদ

পান চাষাবাদ

পানের পরিচিতিঃ-
পান Piperaceae পরিবারের লতা জাতীয় গাছ। পানের ইংরেজি নাম Betel leaf / Betel Vine এবং বৈজ্ঞানিক নাম Piper betel. পান মূলত পাতা খাওয়ার জন্য চাষ করা হয়। এর বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। পানের রস হজমে সহায়তা করে, রুচি বৃদ্ধি করে এবং মুখের দুর্গন্ধ নাশক হিসাবে কাজ করে। বিজ্ঞানীদের ধারনা যে পানের আদি জন্মস্থান মালয়েশিয়ার স্যাঁতসেঁতে স্থানে। বাংলাদেশের খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও রাজশাহী জেলায় ব্যাপকভাবে পানের চাষ হয়। তবে অন্যান্য জেলায়ও পানের চাষ বিস্তার লাভ করছে।

ইকৃষি২৪

ভূমিকাঃ-
পান লতা জাতীয় গাছ । এর বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে । পানের রস হজমে সহায়তা করে, রুচি বৃদ্ধি করে এবং মুখের দুর্গন্ধনাশক হিসাবে কাজ করে । বাংলাদেশের খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও রাজশাহী জেলায় ব্যাপকভাবে পানের চাষ হয় । বর্তমানে পান চাষ লাভজনক হওয়ায় অন্যান্য জেলায়ও পানের চাষ বিস্তৃত হচ্ছে।

রোপন পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনাঃ-
বরজে সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে, তীব্র বাতাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
লতা আঁকড়ে ধরার জন্য অবলম্বনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
চারা রোপণঃ-
প্রতিটি বেডে দুটি সারি থাকবে। প্রতিটি সারিতে ৬-৮ ইঞ্চি পরপর একটি করে গর্ত করতে হবে।
প্রতিটি গর্তে একটি করে কাটিং সারিবদ্ধভাবে লাগাতে হবে।
রোপণের এক মাসের মধ্যে গিরা থেকে অঙ্কুর এবং আগায় নতুন কুশি বের হবে।
এ সময় যখন লতা বড় হতে থাকবে তখন নতুন লতা দু’মিটার লম্বা চিকন বাঁশের খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে।
কাটিং লাগানোর পর যদি কিছু গাছ মারা যায় তাহলে তা সরিয়ে নতুন কাটিং দিয়ে শূণ্যস্থান পূরণ করতে হবে।
অঞ্চল ভিত্তিক চাষকৃত জাতের নাম:-
বরিশালঃ চালতাগোটা, মহানলী, চেরফুলী
চট্রগ্রাম ও বরিশালঃ মিঠা পান
মহেশখালীঃ সাচি পান
উখিয়া, টেকনাফ ও সিলেটঃ গাছ পান
রাজশাহীঃ বাংলা পান
যশোরঃ মিষ্টি পান, ঝাল পান ও ভাবনা
ভোলাঃ ভোলা পান
ময়মনসিংহঃ ভাওলা পান
রংপুরঃ রংপুরী পান
নবাবগঞ্জঃ সন্তোষী পান
বাগেরহাটঃ ঝাইলো পান
অঞ্চলভিত্তিক চারা লাগানোর সময়কালঃ-
চাষকৃত অঞ্চলের নাম রোপণ সময়কাল
কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল মধ্য ফাল্গুন-মধ্য চৈত্র (মার্চ-এপ্রিল)
যশোর মধ্য জৈষ্ঠ্য-মধ্য শ্রাবন (জুন-আগস্ট)
বরিশাল, বাগেরহাট মধ্য জৈষ্ঠ্য-মধ্য আষাঢ় (জুন-জুলাই)
পটুয়াখালী আষাঢ়-শ্রাবণ
রাজশাহী মধ্য মাঘ-মধ্য চৈত্র (ফেব্রুয়ারী-এপ্রিল)
চট্রগ্রাম মধ্য জৈষ্ঠ্য-মধ্য ভাদ্র (জুন-সেপ্টেম্বর)
কক্সাবাজার মধ্য শ্রাবণ-মধ্য ভাদ্র (আগস্ট-সেপ্টেম্বর)

পান সংগ্রহঃ-
ঠিকমত যত্ন ও পরিচর্যা করলে চারা লাগানোর ৫-৬ মাস পর হতে পান তোলা শুরু করা যায়। সাধারনত পানের লতা লাগানোর ৬-৮ মাসের মধ্যে পাতা সংগ্রহ করার উপযুক্ত হয়। রবি মৌসুমের চেয়ে খরিফ মৌসুমে দ্রুত পান সংগ্রহ করা যায়। নিচের দিকের পাতা আগে তুলতে হয়। কচি পাতার চেয়ে বয়স্ক অথচ সবুজ-এমন পাতার চাহিদাই বেশি। পাতা হলুদ হওয়ার পূর্বেই তুলতে হবে, অন্যথায় দাম কমে যাবে। বোঁটাসহ পান লতা থেকে হাত দিয়ে ছিড়েঁ সংগ্রহ করতে হবে। স্থান বিশেষে পান তোলার জন্য বরজ উপযুক্ত হতে সময় লাগে ১-৩ বছর।
প্রতিটি গাছ হতে মাসে ৩/৪ বার এমনকি ৫ বারও পান তোলা যায়। খরিফ ও বর্ষাকালে সপ্তাহে ২ বার পর্যন্ত পান তোলা যায় কিন্তু রবি ও খরার সময় মাত্র একবার তোলা যায়।
ফলনঃ-
বিঘা প্রতি ৬৫০ কেজি বা ২.১৩ লক্ষ পান পাওয়া যায়।
সতর্কতাঃ-
পানে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বালাইনাশক ছিটানোর আগে পান তুলে নিতে হবে এবং ব্যবহারের কমপক্ষে ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে পান পাতা সংগ্রহ করা যাবে না।
বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণঃ-
পান সংগ্রহ করার পর বাছাই করে ছোট, কাঁচা, ছেঁড়া, কাটা, পোকা ও রোগে আক্রান্ত পান বাদ দিতে হবে।
পানের আকার, খাওয়ার উপযোগী, পুরুত্ব ইত্যাদি অনুযায়ী পান বাছাই করতে হবে।
পাতা বেশিক্ষণ সতেজ রাখার জন্য প্যাকিং করার সময় একটু পানি ছিটিয়ে দিতে হবে।
পান পচনশীল হওয়ায় পান তুলার পরপরই তা বিক্রি করতে হবে।
আন্তঃপরিচর্যাঃ-

১) বরজ তৈরির ব্যবস্থাপনাঃ-
পান বরজের উচ্চতা ২.০-২.৫ মিটার রাখা উচিত। বরজের মাঝে ২.০-৩.০ মিটার পরপর বাশেঁর খুটি দিলে মজবুত হয়। বাশেঁর কাঠি,পাট কাঠি, ধানের খড়, কলার বোঁটা ও পাতা বরজের জন্য ব্যবহার করা যায়। উত্তরের ঠান্ডা বাতাস যাতে না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বরজে ৫০-৭৫% ছায়ার সৃষ্টি করতে হবে। বরজ তৈরির পর ৩-৪ বছর কোন খরচ হয় না।

২) সেচ প্রদানঃ-
বরজে রসের অভাব হলে পানি সেচ দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে প্রতিদিনই হাল্কা সেচ দিতে হয়। রবি মৌসুমে ৩-৪ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। বর্ষাকালে খেয়াল রাখতে হবে যাতে এক ঘন্টার বেশি সময় ধরে পানি আটকে না থাকে।

৩) লতা নামানো ও বরজে মাটি তোলাঃ-
পান গাছকে ১.০-১.৫ মিটারের বেশি লম্বা হতে দেয়া উচিত নয়। কারণ অতিরিক্ত লম্বা গাছ থেকে পান সংগ্রহ করা অসুবিধা। তাই পানের লতা যখন বরজের ছাউনি পর্যন্ত (২-২.৫ মি.) উচ্চতায় পৌছায় তখন তা নিচে নামিয়ে পাতাবিহীন অংশকে পেঁচিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এটাকেই পানের লতা নামানো বা ভাঁজ দেওয়া বলে।

ইকৃষি২৪

৪) অন্যান্যঃ-
পানের চারা ২-৩ সপ্তাহের মধ্যেই সতেজ হয়ে উঠে এবং এক মাসের মধ্যে প্রথম পাতা গজায়। চারা একটু বড় হলেই খুটি দিতে হয়। কোন চারা মরে গেলে শূন্যস্থান পূরণ করা, সার প্রয়োগ, গোড়ায় মাটি তুলে দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সেচ ও নিষ্কাশন, লতা নামিয়ে দিতে হয়।

সার প্রয়োগঃ-
জমিতে জৈব সারের পাশাপশি সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। প্রতি শতক জমির জন্য খৈল ২০ কেজি, ২.৫ কেজি এসএসপি, ৬০০ গ্রাম এমওপি এবং ১.৮ কেজি ইউরিয়া সার সমান চার ভাগ করে বছরে ৪ বার জমিতে প্রয়োগ করতে হয়। বর্ষাকালে দু’দফায়, শরৎকালে ১ বার ও বসন্তকালে ১ বার দিতে হয়।

লতা নির্বাচন ও শোধনঃ-
সতেজ ও রোগমুক্ত ৪-৫ বছরের পুরানো বরজ থেকে লতা বা কাটিং সংগ্রহ করতে হবে। গাছের উপরের ১ মিটারের মধ্যে হতেই কাটিং সংগ্রহ করতে হবে। লতা মাটিতে লাগানোর আগে ০.৫% বোর্দো মিক্সারে স্ট্রেপটোসাইক্লিন ২৫০ মিলি গ্রাম (প্রতি ৪ লিটার পানিতে) এবং কার্বোফিউরান (প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম) এর জলীয় দ্রবণে মিনিট চুবিয়ে শোধন করে নিতে হবে। এরপর কাটিং বা লতা ছায়াতে রেখে গায়ে লেগে থাকা দ্রবণ শুকিয়ে নিয়ে লাগাতে হবে। লতা সংগ্রহের ৫-৬ দিন আগে গাছের ডগার দিকে ২-৩ সেমি ভেঙ্গে দিলে ভাল হয়। রোপণ দূরত্ব অনুযায়ী ১০৬৬৭ থেকে ১৩৩৩৩ টি কাটিং লাগাতে হবে।

কাটিং বা চারা প্রস্তুতকরণঃ-
কমপক্ষে ০২ বছর বয়সের পুরাতন, সুস্থ, সবল ও নীরোগ বীজ লতা নির্বাচন করতে হবে। বীজ লতার বয়স ৩-৫ বছর হওয়া উত্তম। কাটিং এর জন্য নির্বাচিত বীজ লতা হতে ৭-৮ মাস পান সংগ্রহ বন্ধ রাখতে হবে। লতা থেকে কাটিং সংগ্রহ করে ৩.১৫ থেকে ৪ ইঞ্চিগভীর উর্বর মাটিতে বর্ষাকালে ২০-২৪ ইঞ্চি এবং শরৎকালে ৭-৮ ইঞ্চি দূরে দূরে লাগাতে হবে।
প্রতিটি কাটিং লম্বায় ১.০ থেকে ১.৫হলে ভাল হয়। প্রতিটি কাটিং এ ৩-৫ টি গিট এবং ৪-৫ টি পাতা থাকা আবশ্যক। সাধারণত ২টি গিট (এক তৃতীয়াংশ) মাটির নিচে এবং এক বা একাধিক গিট মাটির উপরে রাখতে হবে। এলাকা ভেদে বীজ লতার দৈর্ঘ্যের তারতম্য হতে পারে। কোথাও এ দৈর্ঘ্য ৪ ইঞ্চি আবার কোথাও ২.৫ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে।
পানের লতার উপরের ও মাঝের অংশ গোড়ার তুলনায় ভাল। কারণ এ অংশ থেকে তাড়াতাড়ি নতুন কুশি ও শিকড় ছাড়তে পারে।
বীজ লতা হতে কাটিং সংগ্রহ করে প্রায় ৮০ টির মতো কাটিং একত্রে বেঁধে একটি বান্ডিল তৈরি করা হয়। এ বান্ডিলে কাদা মেখে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে। এভাবে দৈনিক ২-৩ বার নতুন করে কাদা লাগাতে হবে বা শুকিয়ে যাওয়া কাদা পানি দিয়ে নরম করে দিতে হবে, ২-৩ দিনের মধ্যে পর্বসন্ধি হতে নতুন শিকড় বের হলে কাটিং লাগাতে হবে। তবে কাটিং ৪ দিনের বেশি রাখা ভাল নয়।
কাটিং লাগানোর সময়ঃ-
সাধারণত বর্ষাকাল বা আষাঢ় মাস চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। কাটিং সামান্য কাৎ করে (৪৫ ডিগ্রী) অর্ধেক অংশ মাটির ভেতর এবং বাকি অংশ চোখ বা মুকুল মাটির ওপর রাখা হয়। দ্বিসারি পদ্ধতিতে ২-৬ ইঞ্চি লম্বা কাটিং লাগে শতক প্রতি ৪০০-৫০০ টি। আশ্বিন-ফাল্গুন মাস লাগানোর উপযুক্ত সময়।

আবহাওয়া ও পরিবেশঃ-
হালকা রোদ-ছায়াযুক্ত স্থানে পান ভাল জন্মায়। আমাদের দেশে খরিফ মৌসুম পানের জন্য উপযুক্ত। অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরমে পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে, কচি ডগা নেতিয়ে পড়ে বা ঢলে পড়ে। দাঁড়ানো পানি পানের জন্য ক্ষতিকর। বরজে প্রয়োজনীয় আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পুকুর বা জলাশয়ের ধারে উঁচু জমি পান চাষের উপযোগী।

নতুন বরোজ তৈরিঃ-
বেড করে চারা লাগাতে হবে। চলাফেরার সুবিধার জন্য ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে। বেডের প্রস্থ হবে ২০ ইঞ্চি এবং ফাঁকা জায়গা থাকবে ২ ফুট, বেডের উচ্চতা হবে ৬ ইঞ্চি। প্রতি বেডে দুটি সারি থাকবে যাদের দূরত্ব হবে ১০ ইঞ্চি। সারিতে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৬-৮ ইঞ্চি।

মাটি শোধনঃ-
চৈত্র-বৈশাখ মাসে ১ মাস ধরে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রেখে মাটি শোধন করে নিতে হবে। উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য মাঝে মধ্যে (সপ্তাহে ১ দিন) বিকালের দিকে চাদর সরিয়ে অল্প পানি ছিটিয়ে আবার পলিথিন সরিয়ে মাটি ঢেকে দিতে হবে। ষাট (৬০) মিলি ফরমালিন ১০ লি. পানি মিশিয়ে প্রতি ব.মি. জমিতে প্রয়োগ করে পলিথিন দিয়ে ৪-৫ দিন ঢেকে রেখে দিতে হবে। এইভাবে মাটি বাহিত রোগ দমন করা যায়। মাটি শোধনের ২০-২৫ দিন পর লতা বসাতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button