অর্থকারী ফসল

আখ চাষ পদ্ধতি

আখ চাষ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা

পরিচিতিঃ
বাংলা নামঃ আঁখ
ইংরেজী নামঃ Sugarcane
বৈজ্ঞানিক নামঃ Saccaram
পরিবারঃ Graminae

বাংলাদেশে ১.৮০ লাখ হেক্টর জমিতে আঁখ আবাদ হয়। বাংলাদেশে আঁখের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪৩ মেট্রিক টন। যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। ভারতে আঁখের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৫৬.৫৭ মেট্রিক টন, ইন্দোনেশিয়ায় ১২৩.৫০ মে. টন এবং তাইওয়ানে ১০১.৬১ মে. টন। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে ২০০-৩০০ মে. টন আঁখ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। অনেক চাষীর জমিতে ২৪৭ মে. টন আঁখ উৎপাদনের রেকর্ড রয়েছে। অতএব, আঁখ আবাদে ফলন বাড়াতে অনুমোদিত জাত ও প্রযুক্তি অনুসরণের বিকল্প নেই

আখের জাত নির্বাচনঃ
জাতের নাম জাতের নাম
গুড় উপযোগী জাত ঈ-১৬, ঈ-২১, ঈ-২২, ঈ-২৪, ঈ-২৫, ঈ-২৯, ঈ-৩০ ও ঈ-৩১
আগাম পরিপক্ব জাত ঈ-১৬, ঈ-২২, ঈ-২৪, ঈ-২৬, ঈ-২৭, ঈ-৩৩, ঈ-৩৫, ঈ-৩৬, ঈ-৩৭, ও ঈ-৩৮
মধ্যম পরিপক্ব জাত ঈ-১৮, ঈ-১৯, ঈ-২০, ঈ-২৮, ঈ-২৯, ঈ-৩১, ঈ-৩২, ও ঈ-৩৪
বন্যা, খরা ও লবনাক্ততা সহিষ্ণু জাত লতারি জবা ‘সি’, ঈ-২০, ঈ-২১, ঈ-২২, ঈ-২৪, ঈ-২৫, ঈ-২৬, ঈ-২৭, ঈ-২৯, ঈ-৩০ও ঈ-৩১
মুড়ি আখের জন্য উপযুক্ত জাত ঈ-২/৫৪, ঈ-২০, ঈ-২১, ঈ-২৭, ঈ-২৮, ঈ-২৯, ঈ-৩০, ঈ-৩১, ঈ-৩২, ঈ-৩৩ ঈ-৩৪
চিবিয়ে খাওয়া জাত সিও-২০৮, অমৃত, বারঙ, গেন্ডারী, কাজলা, মিশ্রিমালা, তুরাগ
* ঈ- ঈশ্বরদী

বীজ নির্বাচনঃ

বীজ নির্বাচনের কাজ বীজ সংগ্রহের ১ বছর আগেই শুরু করতে হবে। বীজের জন্য সম্ভব হলে আলাদা বীজ আঁখ আবাদ করে উপযুক্ত যত্ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে রোগবালাই মুক্ত রাখা সম্ভব। এভাবে আবাদকৃত প্রত্যায়িত বীজ আখ হতে বীজ সংগ্রহ করাই অধিক বিজ্ঞানসম্মত। আট তেকে দশ মাস বয়সী সতেজ রোগমুক্ত বীজ আশানুরুপ অংকুরোদগমের জন্য সবচেয়ে ভাল। বীজ আখ অবশ্যই শিকড়মুক্ত হতে হবে।প্রয়োজনে আখের এক-তৃতীয়াংশ বাদ দিয়ে উপরের দুই তৃতীয়াংশ বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বীজ আখ সংগ্রহের ৪-৫ সপ্তাহ পূর্বে বীজক্ষেতে হেক্টরপ্রতি ১০০ কেজি সার প্রয়োগ করে বীজ আখের গুণগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভব। যে সব এলাকায় মাটিতে পর্যাপ্ত পটাশ নেই সে সব এলাকায় হেক্টরপ্রতি ৪০ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করা যেতে পারে।

বীজখন্ড তৈরিঃ
বীজ আখ কর্তনের পর পাতা না ছাড়িয়েই পরিবহন করা প্রয়োজন। ধারালো এবং জীবাণুমুক্ত দা বা হাসুয়া দিয়ে বীজখন্ড তৈরি করতে হবে। দা পুড়িয়ে বা ডেটল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। বীজগুলো প্রায়োজনমত এক, দুই বা তিন চোখবিশষ্ট খন্ডে তৈরি করতে হবে। যে ক্ষেতে আখ রোপন করা হবে তার পাশেই বীজখন্ড তৈরি করতে হবে। আখের গিরার উপরে ১ ইঞ্চি এবং নিচে ২-২.৫০ ইঞ্চি রেখে বীজখন্ড কাটতে হবে। একটি আখ থেকে সাধারণত ৮-৯টি দু’চোখ বিশিষ্ট বীজখন্ড পাওয়া যায়

বীজ শোধন ও পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদনঃ
আখের বীজ খন্ডগুলো কাটার পর ২০০ শক্তি সম্পন্ন ব্যাভিস্টিন ১ গ্রাম ১ লিটার পরিষ্কার পানিতে মিশিয়ে প্রায় ৩০ মিনিটকাল ডুবিয়ে রাখতে হবে। শোধন করা বীজখন্ডগুলো বীজতলায় অথবা পলিব্যাগে রোপন করতে হবে। পলিব্যাগ ১২.৫ সে. মি. উচু ১০ সে.মি ব্যাস বিশিষ্ট হতে হবে। পলিব্যাগের প্লাস্টিক ০.০২ মিমি পুরু হবে। পলিব্যাগের জন্য ১ ভাগ দোআশ মাটির সাথে সমপরিমান গোবরসার খুব ভালকরে মিশিয়ে মাটি তৈরী করতে হবে। তৈরী করা মাটি দিয়ে পলিব্যাগের অর্ধেক অংশ মাটি দিয়ে ভরে দিন। মাটিতে বীজখন্ড এমনভাবে বসিয়ে দিন যাতে চোখটি মাটির উপর থাকে। সাতদিনের মধ্যে চারা গজাবে এবং ৩ সপ্তাহের মধ্যে শতকরা ৮০-৯০ ভাগ চোখ গজিয়ে চারা হবে। ৪০-৬০ দিনের মধ্যেই প্রতিটা চারায় ৪-৫ টি পাতা গজাবে এবং তখনই চারা লাগানোর সময় হবে। যদি ৬০ দিনের মধ্যে চারা লাগানো না যায় তবে নিচের পাতাগুলো কেটে দিতে হবে এবং প্রয়োজনমত পলিব্যাগে সেচ দিতে হবে। পলিব্যাগের চারাতে মাজরা পোকার আক্রমণ হলে ১৭ মিলি ডায়াজিনন ৬০ ইসি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে চাকাতে সেপ্র করুন। চারাগুলো দুর্বল হলে ১০০ গস্খামইউরিয়া ২০ লিটার পানিতে মিশিয়ে চারায় সেপ্র করুন

আখের গ্যাপ ফিলিংঃ

সনাতন পদ্ধতিতে দুইটি পাশাপাশি চারার মধ্যে ৩০ সে.মি. এর অধিক ফাঁকা থাকলে আখের ফলন কমে যায়। চারা রোপনের ২০/২৫ দিন পর একই বয়সের পলিব্যাগের চারা দিয়ে গ্যাপ পূরণ করলে আখের ফলন বৃদ্ধি পায়।
ফসল কর্তন

আখ সংগ্রহ নির্ভর করে রোপণ কালের সময় অনুযায়ী।
রোপণ কাল কর্তন সময়
আগস্ট- সেপ্টম্বর অক্টোবর – নভেম্বর
আক্টোবর- ডিসেম্বর ডিসেম্বর – জানুয়ারী
ফেব্রুয়ারী – এপ্রিল ফেব্রুয়ারী- মার্চ
আখের মরা পাতা পরিষ্কার করাঃ

আখের মরা পাতা পরিষ্কার করলে পোকা ও রোগের আক্রমণ কম হয়, আখের হেলে পড়া রোধ হয়, কান্ডের রং উজ্জ্বল হয় এবং আখের গুনগত মান বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি আখের ফলন ও চিনি আহরণ বৃদ্ধি পায়।

আগাছা ব্যবস্থাপনাঃ

আখ রোপনের পর ৪৫ থেকে ১৩৫ দিন পর্যন্ত আখের জমি আগাছা মুক্ত রাখা হলে আখের সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়।

(ক) আগাম রোপনঃ
আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে রোপন করলে অধিক অঙ্কুরোদগমক্ষম, কুশি ও মাড়াইযোগ্য আখ বেশী উৎপন্ন হয়। আগাম আখ চাষে শতকরা ৩০-৫০ ভাগ ফলন বৃদ্ধি পায় এবং সাথীফসল চাষের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

(খ) মধ্যম রোপনঃ অক্টোবর-ডিসেম্বরে রোপা পদ্ধতিতে আখ চাষ করা যায়।

(গ) নাবি রোপনঃ ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলে রোপা পদ্ধতিতে আখ চাষ করা সম্ভব।

আখের বীজ শোধনঃ

বীজ বাহিত ছত্রাক আখ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এজন্য চাষের পূর্বে বীজ আখ ব্যাভিষ্টিন/নোইন/জেনুইন প্রভৃতি কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাক নাশকের ০.২% দ্রবণে ৩০ মিনিটকাল ডুবিয়ে শোধন করে বীজতলায় স্থাপন করতে হবে।

আখ চাষের জন্য জমি তৈরি ও সার প্রয়োগঃ

আখ রোপনের পূর্বে জমি ভালভাবে চাষ করে মই দিয়ে সমান করতে হবে। চাষের সময় জমির উর্বরতা ও আখের উৎপাদন ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য হেক্টরপ্রতি ১৫ টন পঁচা গোবর সার প্রয়োগ করে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এর পর কোদাল দিয়ে নালা কেটে সম্পূর্ণ ফসফেট, জিপসাম, জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম এবং এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া ও অর্ধেক পটাশ সার নালায় প্রয়োগ করে কোদাল দিয়ে হালকাভাবে কুপিয়ে সার ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া ও পটাশ সার আখের কুশি উৎপাদন সময়ে (১২০-১৫০ দিনের মধ্যে) উপরি প্রয়োগ করতে হবে। বাকী এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রথম উপরি প্রয়োগের এক মাস পরেই দ্বিতীয় দফায় উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

সারের নাম প্রয়োগমাত্রা (কেজি/হেক্টর)
ইউরিয়া ——– ২৭০
টিএসপি ———১৭৫
এমপি——— ২০০
জিপসাম ———১৪০
ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড -৫০
জিঙ্ক সালফেট -৭

আখের সাথীফসলের প্যাকেজঃ

(ক) একসারি আখের সাথে একটি সাথীফসল চাষ করা যায়, যেমন- আলু/পিঁয়াজ/রসুন/বাঁধাকপি/ফুলকপি/ব্রকলি/ গাজর/পালংশাক/মূলা/মসুর/ছোলা/সরিষা/খেসারি/মাসকালাই/মটরশুটি/ধনিয়া ইত্যাদি

(খ) জোড়াসারি আখের সাথে দুটি সাথীফসল চাষ করা যায়। যেমন, প্রথম সাথীফসল আলু/পিঁয়াজ/রসুন/বাঁধাকপি/ফুলকপি/ব্রকলি/গাজর/পালংশাক/মূলা/গিলাকলমী/মুগবিন/মসুর/ছোলা/মটরসুটি/ খেসারি/মাসকালাই/সরিষা/কালিজিরা/ফিরিঙ্গি/ধনিয়া ইত্যাদি।

(গ) দ্বিতীয় সাথী ফসলঃ মুগডাল/তিল/লালশাক/গিমাকলমী/ডাটাশাক, সবুজ সার হিসাবে ধৈঞ্চা/সনপাট/কাউপি/ নীল ইত্যাদি।সাথী ফসল চাষে আখের ফলনে কোন প্রভাব পড়েনা। অনেক ক্ষেত্রে আখের ফলন বৃদ্ধি পায়।

রোপা পদ্ধতিতে আখ চাষঃ

সরাসরি বীজখন্ড মাঠে রোপনের পরিবর্তে চারা রোপন করায় চারাগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও সমান দূরত্ব বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাড়াইযোগ্য আখ উৎপাদনের মাধ্যমে আখের ফলন বৃদ্ধি করা যায়। এই পদ্ধতিতে আখ চাষের মাধ্যমে সাথী ফসল চাষ করা যায় এবং পোকা-মাকড় ও রোগ-বালাই এর উপদ্রব কম হয়। সাধারণত দুই চোখ বিশিষ্ট আখ খন্ডের অঙ্কুরোদগম হার প্রায় দ্বিগুন ফলে মাড়াইযোগ্য আখ ও ফলন বেশী হয়।

রোপনের দুরত্ব-

(ক) একসারি সনাতন পদ্ধতিঃ

১। আগাম রোপন (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর): সারি থেকে সারি ১০০ সে.মি. , ২ চোখ বিশিষ্ট বীজখন্ড ৩০ সে.মি. পরপর

২। মধ্যম রোপন (অক্টোবর-ডিসেম্বর): সারি থেকে সারি ১০০ সে.মি. , ২/৩ চোখ বিশিষ্ট বীজখন্ড মাথায় মাথায়

৩। নাবি রোপন (ফেব্রুয়ারী-এপ্রিল): সারি থেকে সারি ৭৫ সে.মি. , ৩ চোখ বিশিষ্ট বীজখন্ড দেড়া পদ্ধতিতে।

(খ) একসারি রোপা পদ্ধতিঃ

১। আগাম রোপন (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর): সারি থেকে সারি ১০০ সে.মি. , চারা থেকে চারা ৬০ সে.মি. (১৬,৬৬৭ চারা/হেক্টর)

২। মধ্যম রোপন (অক্টোবর-ডিসেম্বর) : সারি থেকে সারি ১০০ সে.মি. , চারা থেকে চারা ৪৫ সে.মি. (২২,২২৩ চারা/হেক্টর)

৩। নাবি রোপন(ফেব্রুয়ারী-এপ্রিল): সারি থেকে সারি ১০০ সে.মি. , চারা থেকে চারা ৩০ সে.মি. (৪৪,৪৪৫ চারা/হেক্টর)

(গ) জোড়াসারি পদ্ধতিঃ

১। আগাম রোপন (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর): (১৪০ সে.মি. + ৬০ সে.মি.) * ৩০ সে.মি. = (৩৩,৩৩৩ চারা/হেক্টর)

২। মধ্যম রোপন (অক্টোবর-ডিসেম্বর): (১২০ সে.মি. + ৬০ সে.মি.) * ৩০ সে.মি. = (৩৭,০৩৭ চারা/হেক্টর)

৩। নাবি রোপন (ফেব্রুয়ারী-এপ্রিল): (১৫০ সে.মি. + ৪৫ সে.মি.) * ৩০ সে.মি. = (৪৪,৪৪৫ চারা/হেক্টর)

আখের পরিচর্যা
মাটি আলগাকরণ ও আগাছা পরিস্কারঃ
প্রাথমিক অবস্থায় ভারী বৃষ্টিপাতের পর জমিতে জো এলে অবশ্যই মাটি আলগা করে দিতে হবে। সেচ দেয়ার পরও জমিতে জো এলে মাটি আলগা করে দিতে হবে।মাটি আলগাকরণের সময় আগাছা পরিস্কার করতে হবে। ইক্ষু রোপনের পর চার মাস পর্যন্ত অবশ্যই জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

গ্যাপ পূরণঃ
এ গ্যাপ পূরণের জন্য ইক্ষু রোপনের সময় একই জাতের বীজ দিয়ে পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করে রাখতে হবে এবং মূল জমিতে ইক্ষু রোপনের ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ঐ চারা দিয়ে গ্যাপ পূরণ করতে হবে।

আখের গোড়ায় মাটি দেয়াঃ
কুশি বের হওয়া শেষ হলে আর কোন নতুন কুশি হতে না দিয়ে ঝাড়ের গোড়ায় মাটি দিতে হবে। এর ১ মাস পর দ্বিতীয় বার মাটি দিতে হবে।

আখ ঝাড় বাঁধাঃ
আখ হেলে পড়লে কান্ডের বৃদ্ধি মন্থর হয়, পার্শ্ব কুশি গজায়, ওজন ও চিনির পরিমান কমে যায় এবং কিছু আখ মরে যায়। সাধারনত ভাদ্র থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত আখ হেলে পড়ে। তাই ঐ সময় আসার আগেই প্রথমে আখের শুকনো / আধা শুকনো পাতা দিয়ে প্রতিটি ঝাড় আলাদা ভাবে বাধতে হবে। পরে ২ সারির ৩/৪ টি ঝাড় একত্র করে আড়াআড়িভাবে বাধতে হবে। আখ হেলে পড়লে বীজ আখের গুনাগুন নষ্ট হয়। এ কারণে বীজ আখ ক্ষেতে আখ বাধা দরকার।

সেচ প্রয়োগ ও অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনঃ
কেবলমাত্র সেচ প্রয়োগ করেই আখের ফলন ২০-২৫% বৃদ্ধি করা সম্ভব। আগাম আখ চাষের জন্য রোপনের ১-৭, ৩০-৩৫, ৬০-৬৫, ১২০-১২৫ এবং ১৫০-১৫৫ দিন পর মোট ৫ বার সেচ দিতে হবে। যথেষ্ট বৃষ্টিপাত হলে ঐ সময়ে সেচের প্রয়োজন হবে না। দীর্ঘ জলাবদ্ধতা আখের ফলনের উপর মারাত্নক বিরুপ প্রভাব ফেলে। তাই জলাবদ্ধ জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আখের পোকা মাকড়
ডগার মাজরা পোকা আক্রমণের লক্ষণ-
ডিম হতে সদ্য ফুটে বের হওয়া কীড়াগুলো পাতার মধ্যশিরার মধ্য দিয়ে গর্ত করে শেষ পর্যন- কান্ডের উপরের মাথার শেষ প্রানে- পৌঁছে। নবীন পাতার মধ্যশিরার উপর পেন্সিলের দাগের ন্যায় সুড়ঙ্গ পথের উপসি’তিই এই পোকার আক্রমণের প্রথম লক্ষণ।
এই দাগ পরে লাল রং ধারণ করে। নতুন উন্মোচিত পাতার গায়ে পাশাপাশি দুটি সমান-রাল সারিতে গুলির দাগের মতো ছিদ্রের উপসি’তি এই পোকার আক্রমণ সনাক্ত করার আরেকটি উপায়। আক্রান্ত গাছের মাইজ পাতা মরে যায়। মরা মাইজ পাতা ধরে টান দিলে সহজে খুলে আসে না। নবীন কুশি আক্রান্ত হলে দ্রুত মারা যায়। বয়স্ক গাছ আক্রান্ত হলে শুধু বর্ধিষ্ণু অঞ্চলটিই ক্ষতিগ্রস’ হয় এবং পরে চোখ হতে পার্শ্ব শাখা বের হয়।

যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি-
এই পোকার স্ত্রী মথ সবুজ পাতার নীচের দিকে গাদা করে ডিম পাড়ে। এগুলো সামান্য পাতাসহ কেটে সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন- এই পোকার মথ ধরে হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলতে হবে। ফেব্রুয়ারী থেকে জুন পর্যন- আক্রান- গাছগুলো পোকাসহ কেটে ধ্বংস করতে হবে

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি-
ক) ফুরাডান ৫জি/কুরাটার ৫জি/ ফুরাটাফ ৫জি/ ফুরাফুরান ৫জি/ সানফুরান ৫জি/ ব্রিফার ৫জি/ ফেনডোর ৫জি এর যে কোন ১টি কীটনাশক হেক্টর প্রতি ৪০ কেজি অথবা মার্শাল ৬জি কীটনাশক হে: প্রতি ৩৩ কেজি আখের সারির দু পাশে নালায় প্রয়োগ করতে হবে। অত:পর মাটি দিয়ে ঢেকে সেচ দিতে হবে। ১ম বার মার্চে এবং ২য় বার মে মাসে মোট দুবার প্রয়োগ করতে হবে।

আগাম মাজরা পোকা আক্রমণের লক্ষণ-
এই পোকার কীড়া মাটির সমতলে অবসি’ত কান্ড বা কুশির অংশ বিশেষে প্রবেশ করে। ১টি চারায় ১টি কীড়া প্রবেশ করে প্রবেশাঞ্চলের কোষ সমূহ সম্পুর্ন খেয়ে ফেলে। ফলে গাছের মাইজ মরে যায়। মাইজ ধরে টান দিলে সহজেই খুলে আসে। আক্রান্ত নবিন কুশি গুলি মারা যায়। ঝাড়ের সব কুশি গুলো ধ্বংস হলে ক্ষেতে শূণ্য স্হান সৃষ্টি হয়। ফেব্রুয়ারী থেকে মে পর্যন- এই পোকার আক্রমণ তীব্র হয়।

যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি-
জানুয়ারী থেকে মে পর্যন- আক্রান- গাছ গুলি মাটির নিচ থেকে তুলে পোকাসহ ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি-
ক) ফুরাডান ৫জি/কুরাটার ৫জি/ ফুরাটাফ ৫জি/ সানফুরান ৫জি/ এগ্রি ফুরান ৫জি/ ব্রিফার ৫জি/ ফেনডোর ৫জি/ ফুরাসান ৫জি/ রাজ ফুরান ৫জি এর যে কোন ১টি কীটনাশক হেক্টর প্রতি ৪০ কেজি অথবা মার্শাল ৬জি কীটনাশক হে: প্রতি ৩৩ কেজি অথবা লরস্‌বান ১৫ জি কীটনাশকটি হেক্টর প্রতি ১৫ কেজি রোপনের সময় নালায় অথবা পোকার ২য় প্রজন্মে (ফেব্রুয়ারী মাসে) আখের সারির দু পাশে ৮ সেমি গভীর নালায় ও গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে সেচ দিতে হবে। অথবা রিজেন্ট ৫০ এসসি কীটনাশকটি হেক্টর প্রতি ২ লিটার হারে রোপনকৃত বীজখন্ডের উপর সেপ্র করতে হবে।

কান্ডের মাজরা পোকা আক্রমণের লক্ষণ-
প্রাথমিক লক্ষণ হলো ক্ষেতের মধ্যে শুকনো মাথা বিশিষ্ট আখ গাছের উপসি’তি। পোকা আক্রমণের ফলে উপরের সমস- পাতাগুলো মরে যায়। আক্রান্ত কান্ডের গায়ে গুলির ছিদ্রের ন্যায় অসংখ্য ছিদ্র দেখা যায়। এগুলো দিয়ে করাতের গুড়োর মত লাল পদার্থ বের হয়। আক্রান্ত কান্ডের মধ্যে ২০০ পর্যন- কীড়া পাওয়া যায়। অতিমাত্রায় আক্রান্ত কান্ডগুলো হতে ক্ষেতে আক্রমণ ব্যপকভাকে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত বয়স্ক আখগাছে মাত্র কয়েকটি কীড়া পাওয়া যায়। এ অবস্হায় ক্ষেতে শুকিয়ে যাওয়া মাথা সচরাচর দেখা যায় না।

যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি-
মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন- প্রাথমিক আক্রান- গাছগুলো পোকাসহ কেটে ধ্বংস করতে হবে।

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি-
পাদান ৪ জি হেক্টরপ্রতি ৭৫ কেজি আখের সারির উভয় পাশে নালা কেটে ছিটিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন- ২-৩ বার প্রয়োগ করতে হবে।

গোড়ার মাজরা পোকা আক্রমণের লক্ষণ-

এই পোকার কীড়া মাটির নীচে অবসি’ত গাছের অংশে প্রবেশ করে। সেখানকার কোষগুলি খেয়ে ফেলে। ফলে নতুন চারাগুলোর মাইজ মরে যায়। মাইজ ধরে টান দিলে সহজেই খুলে আসে না। আক্রমণ তীব্র হলে চারাগুলো মরে গিয়ে ল ক্ষেতে শূণ্য স্হানের সৃষ্টি হয়। বর্ষাকালে এদের আক্রমণ হ্রাস পেলেও অতিমাত্রায় আক্রান্ত ক্ষেতে ধ্বংসযজ্ঞ আখ কাটার আগে পর্যন- অব্যাহত থাকে। পাতার হলুদ-বাদামী রং ধারণ গোড়ার মাজরা পোকা আক্রমণের তীব্রতা হ্রাসের একটি নিদর্শন।

যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি-
এই পোকার কীড়া ও পুত্তলীগুলো আখ গাছের নীচের অংশে থেকে যায় ফলে সেখান থেকে তারা পূর্ণাংগ মথ হয়ে নুতন আখে আক্রমণ করে। কাজেই এই পোকা দমনের জন্য আখ কাটার পর ঝাড়ের মোথাগুলো চাষ দিয়ে তুলে ফেলে জমা করে পোকাগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হবে। এলাকায় সকল চাষীকে একযোগে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি-
লরস্‌বান ১৫ জি হেক্টর প্রতি ১৫ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। মার্চ, মে ও জুলাই মাসে ৩ বার প্রয়োগ করলে কার্যকরীভাবে দমন সম্ভব হবে।

হোয়াইট গ্রাব আক্রমণের লক্ষণ-
গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাওয়া ও পাতার হাল্কা হলুদ রং ধারণ ক্ষেতে হোয়াইট গ্রাব আক্রমণের প্রথম লক্ষণ। ভীষণভাবে আক্রান্ত গাছ মারা যায়। পোকার কীড়াগুলো শিকড়ের কোষসমূহ খেতে থাকে এবং ক্রমে সমস- শিকড়গুচ্ছ ধ্বংস করে। মাঝে মাঝেই পোকার কীড়াগুলো মাটির নীচে অবসি’ত কান্ডের মধ্যে ঢুকে কান্ডের কোষগুলো খেতে থাকে। আক্রান্ত আখের ঝাড়গুলো অতি সহজেই মাটি থেকে টেনে তোলা যায়।

যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি-
হোয়াইট গ্রাবের বিটলগুলো সন্ধ্যাবেলা মাঠ থেকে উঠে এসে আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা ইত্যাদি গাছে আশ্রয় নেয় এবং রাতে অবস্হান করে। আবার ভোর বেলায় মাঠে প্রত্যাবর্তন করে। গাছে আশ্রয় নেয়া বিটল জানুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন- আলোর ফাঁদে আঁটকে মারতে হবে।

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি-
ফুরাডান ৫জি/কুরাটার ৫জি/ ফুরাটাফ ৫জি/ সানফুরান ৫জি/ এগ্রি ফুরান ৫জি/ ব্রিফার ৫জি/ ফেনডোর ৫জি/ ফুরাসান ৫জি/ রাজ ফুরান ৫জি এর যে কোন ১টি কীটনাশক হেক্টর প্রতি ৪০ কেজি অথবা মার্শাল ৬জি কীটনাশক হে: প্রতি ৩৩ কেজি অথবা লরস্‌বান ১৫ জি কীটনাশকটি হেক্টর প্রতি ১৫ কেজি নালায় ও গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে সেচ দিতে হবে। ১ম বার মার্চে এবং ২য় বার এপ্রিলে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

উই পোকা আক্রমণের লক্ষণ-
উইপোকা জমিতে রোপন করা বীজখন্ডের দুই পাশের কাটা অংশ দিয়ে ঢুকে ভিতরের সবকিছু খেয়ে ফেলতে পারে। চোখও এদের আক্রমণের শিকার হয়। বয়স্ক আখ গাছের মাটি সংলগ্ন অংশ দিয়ে ঢুকে কোষসমূহ খেতে খেতে এরা উপরের দিকে উঠতে থাকে। নবীন চারাগুলো এদের আক্রমণে মারা যায়না কিন’ পাতা মলীন হলুদ রং ধারণ করে, কুশি বেরোনো ও শিকড় সৃষ্টি কমিয়ে দেয়।

যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি-
আশে পাশের জমিতে উই পোকার ঢিপি দেখলে তা কোদাল দিয়ে খুঁড়ে ভেঙ্গে ফেলতে হবে। রাণী উইকে খুঁজে বের করে মেরে ফেলতে হবে।

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি-
নিম্নের ক,খ,গ, ঘ. ঙ এর যে কোন একটি ব্যবস্হা অবলম্বন করে উইপোকা দমন করা সম্ভব।

ক) ১ লিটার পানিতে গাউচো ৭০ ডব্লিউএস ২ গ্রাম/ক্রুজার ৭০ ডব্লিউএস ১ গ্রাম/টিড্ডো ২০ ইসি ৭ মিলি মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করে রোপনের পূর্বে বীজখন্ডগুলো ৩০ মিনিট চুবিয়ে শোধন করে রোপন করতে হবে।

খ) রাগবি ১০ জি/পাউন্স ১.৫ জি হেক্টর প্রতি ২০ কেজি বীজখন্ড রোপনের সময় একবার (১ম বার) নালায় এবং মে মাসে (২য় বার) আখের সারির উভয় পাশে নালা কেটে নালায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে রিজেন্ট ৩ জি আর কীটনাশক হেক্টরপ্রতি ৩৩ কেজি রোপনের সময় নালায় বীজখন্ডের উপর ছিটিয়ে প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে অথবা লরস্‌বান ১৫ জি কীটনাশকটি হেক্টর প্রতি ১৫ কেজি রোপনের সময় নালায় প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে সেচ দিতে হবে।
গ) রিজেন্ট ৫০ এসসি কীটনাশকটি হেক্টর প্রতি ২ লিটার অথবা এডমায়ার ২০০ এসএল হেক্টরপ্রতি ১ লিটার হারে রোপনকৃত বীজখন্ডের উপর সেপ্র করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

ঘ) ডারসবান ২০ ইসি/ পাইরিফস ২০ ইসি/ ক্লাসিক ২০ ইসি হেক্টরপ্রতি ১১.২৫ লিটার বীজখন্ড রোপনের সময় নালায় (১ম বার) মার্চ মাসে (২য় বার) এবং মে মাসে (৩য় বার) পানির সাথে মিশিয়ে আখের সারির উভয় পাশে নালা কেটে নালায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

ঙ) টলস্টার ২ ডব্লিউপি হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি হারে পানির সাথে মিশিয়ে রোপনের সময় সেপ্র করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। দ্বিতীয়বার মে মাসে গাছের গোড়ায় সেপ্র করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

পাইরিলা আক্রমণের লক্ষণ-
নিম্ফ এবং বয়স্ক পোকা উভয়ই দলবদ্ধভাবে সবুজ পাতার নিম্নাংশ হতে রস শোষণ করে। রস শোষণ করার সময় পোকার শরীর হতে মধু জাতীয় পদার্থ নির্গত হয় যা সুটি মোল্ড নামক ছত্রাকের আক্রমণ ও বংশবিস-ারে সহায়ক হয়। এতে পাতার আলোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।

যান্ত্রিক দমন পদ্ধতি-
ফেব্রুয়ারী থেকে জুন পর্যন- হাত জাল দ্বারা নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে।

জৈবিক দমন পদ্ধতি-
এদের পূর্ণাঙ্গ/ নিম্ফের পরজীবি ইপিরিকানিয়ার পিউপা ( যা পাতায় লেগে থাকে) এবং ডিমের পরজীবি টেট্রাসটিকাস পাইরিলি (পাতায় ডিমের মধ্যে থাকে) এক জমি থেকে অন্য জমিতে বা এক স্হান থেকে অন্য স্হানে মাধ্যমে বিস্তার করে পাইরিলা দমন করা যেতে পারে।

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি-
এডমায়ার / ইমিটাফ নামক কীটনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর সেপ্র করতে হবে।

আখের রোগ সমূহ

লাল পচা রোগের লক্ষণ –
এই রোগের আক্রমনে প্রধানত আখের কান্ড পচে যায়। অবশ্য পাতাও আক্রান্ত হতে পারে। কান্ডের গায়ে অবসি’ত পাতার গোড়া, বৃদ্ধিজনিত ফাটল কিংবা ক্ষতের মধ্যদিয়ে এ রোগের জীবাণু গাছের ভিতর প্রবেশ করে।
যে অংশে জীবাণু প্রবেশ করে সেখানে অবসি’ত কোষগুলো দ্রুত লাল রং ধারণ করে পচতে শুরু করে। রোগের এ পর্যায়ে বাহ্যিক কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অনুকুল পরিবেশে সমস- কান্ড পচে যেতে পারে। এই অবস্থায় পের পাতাগুলো হলুদ হয়ে আসে- এবং মরে যায়। আক্রান্ত আখ লম্বালম্বিভাবে কাটা হলে দেখা যায় যে, কোষগুলো পচে লাল রং ধারণ করেছে।লাল রং এর মধ্যে আড়াআড়িভাবে ছোপ ছোপ সাদা অংশ দ্বারা বিভক্তি দেখা যায়

স্মাট রোগ আক্রান-
আখের পত্রগুচ্ছের মধ্য হতে চাবুকের মত একটি কয়েক ফুট লম্বা কালো শীষের উৎপত্তি হয়। চাবুকের সর্বোচ্চ অংশ বাঁকানো হতে পারে। প্রথম দিকে কালো শীষটি পাতলা রুপালি ঝিল্লি বা পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। পর্দার ভিতরে কালো ঝুলকালির মত বস’গুলো স্মাট রোগের লক্ষ লক্ষ জীবাণু। এক পর্যায়ে রুপালি পর্দা ফেটে যায় এবং শীষ থেকে অসংখ্য জীবাণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। স্মাট আক্রান- ঝাড়ে সুস’ গাছের চেয়ে কুশির সংখ্যা অনেক বেশী হয় এবং ঘাসের মত মনে হয়।

উইল্ট রোগ লক্ষণ
প্রায় লালপচা রোগের অনুরুপ। আক্রান- গাছের পাতাগুলো আসে- আসে- হলুদ হয়ে মরে যায়। আক্রান- গাছ লম্বালম্বি কাটলে ভিতরের কোষসমূহ বেগুনি অথবা লাল রংধারণ করেছে বলে মনে হবে। ভিতরের মজ্জার কোষগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে এবং ফাঁপা খোলের মত এলাকার সৃষ্টি হয়। চার-পাঁচ মাস বয়সে রোগের আক্রমন হলেও বয়স্ক আখ ছাড়া বাহ্যিক লক্ষন সুস্পস্ট হয় না।

ইক্ষুর রোগ দমন পদ্ধতি সমূহঃ
ইক্ষুর উপরোক্ত রোগ সমূহ দমনের জন্য নিম্নের পদ্ধতি সমূহের এক বা একাধিক ব্যবস্হায় সমন্বিতভাবে নিতে হবে।

ক) বীজ আখ শোধন –
আখ লাগানোর পূর্বে বীজখন্ডগুলোকে ০.১% ব্যাভিস্টিন দ্রবণে (পানি ও ব্যাভিস্টিনের অনুপাত ১০০০ঃ১) ৩০ মিনিট ধরে শোধন করে রোপন করতে হবে। হেক্টর প্রতি প্রয়োজনীয় ৭-৭.৫ টন বীজ আখ শোধনের জন্য ২৫০ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ২৫০ লিটার পানিতে মিশিয়ে দ্রবন তৈরী করতে হবে।

খ) আর্দ্র গরম বাতাসে বীজ শোধন-
( এম এইচ এ টি) – বীজখন্ড অথবা অর্ধেক সাইজের বা সম্পূর্ণ আখ এম এইচ এ টি প্লান্টে ৫৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ও ৯৫% এর অধিক আর্দ্রতায় ৪ ঘন্টাকাল শোধন করা হয়। শোধিত বীজ ঠান্ডা হলে ০.১% ব্যাভিস্টিন বা নোইন দ্রবণে ৩০ মিনিট শোধন করে মাটিতে রোপন করতে হবে। তাপ শোধিত বীজ ব্যাভিস্টিন বা নোইন দ্রবণে শোধন না করে সরাসরি রোপন করলে দেড় গুন বীজের প্রয়োজন হয়।

গ) গরম পানিতে বীজ শোধন –
সম্পূর্ণ আখ বা বীজ খন্ড গরম পানিতে বীজ শোধন যন্ত্রে ৫০ ডিগ্রী সেঃ তাপমাত্রায় ৩ ঘন্টাকাল শোধন করা হয়। শোধিত বীজ ঠান্ডা হলে ০.১% ব্যাভিস্টিন বা নোইন দ্রবণে ৩০ মিনিট শোধন করে মাটিতে রোপন করতে হবে। তাপ শোধিত বীজ ব্যাভিস্টিন বা নোইন দ্রবণে শোধন না করে সরাসরি রোপন করলে দুই গুন বীজের প্রয়োজন হয়।

ঘ) রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার –
মোজাইক রোগমুক্ত বীজ প্লটের বীজ ব্যবহার করে এ রোগের আক্রমন প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

ঙ) রগিং –
বীজ আখ ক্ষেতে ২/৩ মাস অন্তর অন্তর মোজাইক রোগাক্রান- গাছ ঝাড় সহ তুলে ফেলতে হবে। বাহ্যিকভাবে যে কোন বীজবাহিত রোগ যথা লালপচা, স্মাট, সাদাপাতা, লীফ স্কাল্ড ইত্যাদি দেখা গেলে তা ঝাড় সহ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

চ) ইক্ষুর পরজীবি বিজলী ঘাস দমন –
আক্রান্ত জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বিশেষ করে একর প্রতি ১৬০ কেজি ইউরিয়া সার সমান ৩ কিসি-তে (রোপনের সময় নালায়, বৃষ্টিপাতের পর এপ্রিলে ও জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ) আখের জমিতে প্রয়োগ করতে হয়।
বিজলী ঘাস দেখা গেলে ৫% ইউরিয়া দ্রবন (ইউরিয়াঃপানি=১ঃ২০) রোদ্রজ্জল দিনে বিজলী ঘাসের উপর সেপ্র করলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঘাস মারা যায়।

ছ) ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলা –
আখ কাটার পর জমিতে চাষ দিয়ে ফসলের অবশিষ্টাংশ একত্র করে পুড়িয়ে ফেললে অনেক পোকা ও রোগজীবাণুর আক্রমন প্রতিহত করা যায়।

ফসল সংগ্রহঃ
আশ্বিন মাস থেকে ফাল্গুন- চৈত্র মাস পর্যন- আখ সংগ্রহ করা হয়।

মুড়ি আখ চাষঃ
মুড়ি আখের চাষ মূল আখ চাষের চেয়ে লাভজনক। মুড়ি আখ চাষের ক্ষেত্রে বীজের প্রয়োজন হয় না। বীজ রোপন এবং জমি তৈরীর খরচ অনেক কম লাগে। মুড়ি আখ অনেক আগেই পরিপক্কতা লাভ করায় আগাম গুড় উৎপাদন করা যায় এবং চিনি কলে অধিক চিনি আহরন করা যায়। মুড়ি আখ চাষের জন্য আখ কাটার ৭ দিনের মধ্যে মূল আখের পাতা ও পরিত্যাক্ত অংশ পুড়িয়ে, মোথা মাটির সমতলে কেটে ফেলা হয়।

এরপর দুই সারি আখের মাঝে লাংগল দিয়ে ৩/৪ টি চাষ বা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে অনুমোদিত মাত্রার অর্ধেক ইউরিয়া ও এমপি এবং সম্পূর্ণ টিএসপি সার প্রয়োগ করে মই দিয়ে জমি সমান করা হয়। অবশিষ্ট ইউরিয়া ও এমপি সার কুশি বের হওয়ার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে। হেক্টর প্রতি সারের মাত্রা মূল আখ চাষের অনুরুপ তবে মুড়ি আখের ক্ষেতে হেক্টর প্রতি ১০০ কেজি ইউরিয়া সার বেশী দিতে হয়। নতুন রোপনকৃত ইক্ষু কাটার পর সেই জমিতে কমপক্ষে একবার মুড়ি আখের চাষ করা উচিৎ।
যে জমিতে মুড়ি আখ চাষ করা হবে তার আখ কোন সময়ই তীব্র শীতের মধ্যে কাটা উচিৎ নয়। ক্ষেতে ফাঁকা জায়গা দেখা গেলে পলিব্যাগে উৎপন্ন চারা (ফসল কাটার ১ মাস পূর্বে তৈরীকৃত) দ্বার তা পূরণ করতে হবে। সাধারণত জমির আখ কাটার ১৫ দিনের মধ্যেই নতুন চারা দিয়ে গ্যাপ পূরণ করা ভাল

আখের সাথি ফসল আখের সাথি ফসলঃ
আখের জমিতে সাথি ফসল হিসেবে আলু, পিয়াজ, রসুন, মসুর ইত্যাদি ফসল চাষ করা যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button