ফল চাষ

কলা চাষাবাদ পদ্ধতি

কলা চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

পরিচিতি
বাংলা নামঃ কলা
ইংরেজী নামঃ Banana
বৈজ্ঞানিক নামঃ Musa sapientum L; Musa paradisiaca; Musa cavendishii.
পরিবারঃ Musaceae

গুরুত্বঃ
কলা বারমাসি ফল। কাঁচা কলাতে প্রচুরপরিমাণ আয়রন ও ফসফরাস পাওয়া। পাকা কলাতে ভিটামিন-বি, ফসফরাস ও শর্করা পাওয়া যায়।

জাত পরিচিতিঃ
জাত পরিচিতি
বারি কলা-১ ১)উচ্চ ফলনশীল এই জাতটি বি এ আর আই থেকে ২০০০ সালে উদ্ভাবিত হয়েছে।
২)গাছ অমৃতসাগর জাতের গাছের চেয়ে ছোট হয় অথচ ফলন দেড় থেকে দুই গুণ বেশি হয়।
৩) দেখতে অমৃতসাগর ও মেহেরসাগর কলার মত এই জাতটির গড় ফলন ২৫ কেজি (কাদিপ্রতি) ।
৪)উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এ জাতের কাদিতে ১৫০-২০০ টি কলা পাওয়া যেতে পারে।
৫)রোপণের ১১-১২ মাসের মধ্যে কলা সংগ্রহের উপযুক্ত হয়। শীতকালে সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি, গরমকালে তুলনামূলক ভাবে কম।
৬) জাতটি বানচি টপ ভাইরাস ও সিগাটোকা রোগের প্রতি সংবেদনশীল ।
৭) হেক্টরপ্রতি ফলন ৫০-৬০ টন । দেশের সকল এলাকায় চাষোপযোগী ।
বারি কলা-২ ১)উচ্চফলনশীল, পানামা ও সিগাটোকা রোগ প্রতিরোধী এই কাঁচকলার জাতটি বিদেশ থেকে সংগৃহীত, বি এ আর আই থেকে ২০০০ সালে উদ্ভাবিত।
২) গাছ বেশ মোটা, শক্ত এবং মাঝারী আকারের । গাছে সাকারের সংখ্যা কম (২-৩টি) রোপণের ১১-১২ মাসের মধ্যে ফল আহরণের উপযোগী হয় ।
৩) কলার কাদির ওজন ১৫-২০ কেজি, কলার সংখ্যা ১০০-১৫০ টি ।
৪)ফল সহজে সিদ্ধ হয়, খেতে সুস্বাদু । হেক্টরপ্রতি ফলন ৩৫-৪০ টন ।
৪) দেশের সব এলাকায় চাষযোগ্য।
বারি কলা-৩ ১)এটি বাংলা কলার উচ্চ ফলনশীল জাত, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সংগৃহীত, জার্মপ্লাজম থেকে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০০৫ সালে অনুমোদন দেওয়া হয় । জাতটি রোগ ও পোকামাকড় সহনশীল । ২)ফল পাকার পরেও ৫ দিন পর্যন্ত ঘরে রেখে খাওয়া যায় ।
৩)ফল মধ্যম আকারের, প্রতি কাদিতে ১৪০-১৫০ টি কলা হয় ।
৪)ফল সহজে সিদ্ধ হয়, খেতে সুস্বাদু ।
৫) হেক্টরপ্রতি ফলন ৪৫-৫০ টন ।
৬) এই জাত দেশের সর্বত্র চাষোপযোগী ।
বারি কলা-৪ ১)পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা থেকে নির্বাচিত চাপা কলার একটি উচ্চ ফলনশীল জাত ।
২) জাতটি সারা দেশে চাষাবাদের জন্য ২০০৬ সালে মুক্তায়ন করা হয় ।
৩)ফল মাঝারি আকারের, প্রতি কাদিতে ফলের সংখ্যা প্রায় ১৭৮ টি, গড় ওজন প্রায় ১৯ কেজি ।
৪)ফল সম্পূর্ণ বীজহীন, টক-মিষ্টি ।
৫) ফল মধ্যম আকারের, প্রতি কাদিতে ১৪০-১৫০ টি কলা হয় ।
৬) হেক্টরপ্রতি ফলন ৪০-৪৫ টন ।
৭) রোগ ও পোকামাকড় সহনশীল, দেশের সর্বত্র চাষোপযোগী ।

পাকা কলার জাতঃ
অমৃতসাগর, মেহেরসাগর, সবরি, অনুপম, চাম্পা, কবরী, নেপালি, মোহনভোগ, মানিক, বারি কলা-৩, বারি কলা-৪ সহ বিভিন্ন জাতের পাকা কলা চাষ হয়ে থাকে ।
কাঁচা কলার জাতঃ
ভেড়ারডগ, চোয়ালপাউশ, বড়ভাগনে, বেহুলা, মন্দিরা, বিয়ের বাতি, কাপাসি, কাঁঠালী, হাটহাজারী, আনাজী, বারি কলা-১, বারি কলা-২ এবং বারি কলা-৫ জাতের কাঁচাকলা অন্যতম ।
মাটিঃ
পর্যাপ্ত রোদযুক্ত ও পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা সম্পন্ন উঁচু জমি কলা চাষের জন্য উপযুক্ত । উর্বর দোআঁশ মাটি কলা চাষের জন্য উত্তম ।
জমি তৈরী ও গর্ত খননঃ
জমি ভালভাবে গভীর করে চাষ করতে হয় । দেড় থেকে দুই মিটার দূরে দূরে ৬০ × ৬০ × ৬০ সেমি আকারের গর্ত খনন করতে হবে। চারা রোপণের মাস খানেক আগেই গর্ত খনন করতে হয়। গর্তের মাটির সাথে জৈব সার ও টিএসপি সার মিশিয়ে গর্ত বন্ধ করে রাখতে হবে।
চারা রোপণের সময়ঃ
কলার চারা বছরে তিন মৌসুমে রোপণ করা যায়-
ক) ১ম রোপণঃ আশ্বিন-কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর-মধ্য নভেম্বর)
খ) ২য় রোপণঃ মাঘ-ফাল্গুন (মধ্য জানুয়ারি-মধ্য মার্চ)
গ) ৩য় রোপণঃ চৈত্র-বৈশাখ (মধ্য মার্চ- মধ্য মে)

চারা রোপণ পদ্ধতিঃ

চারা রোপণের জন্য অসি তেউড় (Sword Sucker) সবচেয়ে ভাল। অসি তেউড়ের পাতা সরু ও সুচালো, অনেকটা তলোয়ারের মত। গুড়ি বড়, শক্তিশালী, কান্ড ক্রমশ নিচের দিক থেকে উপরের দিকে সরু হয়।
তিন মাস বয়সের সুস্থ, সবল তেউড় রোগমুক্ত বাগান থেকে সংগ্রহ করতে হবে। সাধারণত খাটো জাতের গাছের ৩৫-৪৫ সেমি এবং লম্বা জাতের গাছের ৫০-৬০ সেমি. দৈর্ঘ্যের তেউড় ব্যবহার করা হয়। এছাড়া টিস্যু কালচারের মাধ্যমে কলার চারা তৈরী করা যায়।
সারের পরিমাণঃ
কলা চাষের জন্য গাছ প্রতি নিম্নরুপ সার ব্যবহার করা যেতে পারে –

সারের নাম হেক্টর প্রতি
জৈব সার/পচা গোবর ১৫-২০ কেজি
ইউরিয়া ৫০০-৬৫০ গ্রাম
টিএসপি ৪০০ গ্রাম
এমওপি ৬০০ গ্রাম
জিপসাম ২০০-৩০০ গ্রাম

সার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ
পচা গোবর, টিএসপি ও জিপসামের ৫০% জমি তৈরীর শেষ চাষের সময় এবং অবশিষ্ট গোবর, টিএসপি, জিপসাম ও এমওপির ২৫% গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। রোপণের দেড় থেকে দুই মাস পর ২৫% ইউরিয়া এবং ২৫% এমওপি মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এর দুই মাস পর পর গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম পটাশ ও ৭৫ গ্রাম ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। ফুল আসার পর এর পরিমাণ দ্বিগুন করতে হবে।

সেচ
শুকনো মৌসুমে ১৫-২০ দিন পরপর সেচের প্রয়োজন হয়। গাছ বৃদ্ধির প্রথম অবস্থায় বিশেষ করে রোপণের প্রথম চারমাস কলা বাগান আগাছা মুক্ত রাখা খুব জরুরী । কলা বাগানের জমিতে যাতে পানি না জমে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। প্রয়োজন হলে পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা কেটে দিতে হবে ।

আন্তঃফসল
চারা রোপণের প্রথম ৪-৫ মাস বলতে গেলে জমি ফাকাই থাকে। যদি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চারা রোপণ করা হয় তবে কলা বাগানের মধ্যে আন্তঃফসল হিসাবে রবি মৌসুমের সবজি চাষ করা যেতে পারে। তবে এসব আন্তঃফসলের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সার দিতে হবে। জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী (মাঘ) মাসে চারা রোপণ করলেও আন্তঃফসল হিসাবে কুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা ইত্যাদি বাড়তি ফসল উৎপাদন করা যায়।

ফলের যত্ন
গাছে থোড় আসার পরপরই গাছ যাতে বাতাসে ভেঙ্গে না যায় সেজন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে বাতাসের বিপরীত দিক থেকে গাছে ঠেস দেয়া খুবই জরুরী। থোড় থেকে কলা বের হওয়ার আগেই গোটা থোড় স্বচ্ছ বা সবুজ পলি ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেয়া দরকার। পলি ব্যাগের নীচের দিকের মুখ একটু খোলা রাখতে হবে।
পরিচর্যাঃ
চারা রোপণের পর মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে তখনই সেচ দেয়া উচিত। এ ছাড়া, শুকনো মৌসুমে ১৫-২০ দিন পর সেচ দেয়া দরকার। বর্ষার সময় কলা বাগানে যাতে পানি না জমতে পারে তার জন্য নালা থাকা আবশ্যক। তাছাড়া গাছের গোড়া ও নালার আগাছা সব সময় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। মোচা আসার আগ পর্যন্ত গাছের গোড়ায় কোন তেউড় রাখা উচিত নয়। মোচা আসার পর গাছ প্রতি একটি তেউড় বাড়তে দেয়া ভাল।

পোকামাকড়
কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা দিনের বেলা পাতার গোড়ায় লুকিয়ে থাকে এবং রাত্রে বের হয়ে কচি পাতার সবুজ অংশের রস চুষে খায়। ফলে অসংখ্য দাগের সৃষ্টি হয়। কলা বের হওয়ার সময় হলে পোকা মোচার মধ্যে ঢুকে কচি কলার রস চুষে খায়। ফলে কলার গায়ে বসন্ত রোগের দাগের মত দাগ হয়। এ পোকা দমনে নিন্মলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। ক) পোকা আক্রা্ন মাঠে বার বার কলা চাষ না করা। খ) কলার মোচা বের হওয়ার সময় পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রামন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। গ) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউ পি অথবা ম্যালাথিয়ন অথবা লিবাডিস ৫০ ইসি ২ মি.লি. মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর গাছের পাতার গোড়ায় ছিটাতে হবে।

রোগবালাই
পানামা রোগ এটি একটি ছত্রাক জাতীয় মারাত্নক রোগ। এ রোগের আক্রমণে প্রথম বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ হয়ে যায় এবং পরে কচি পাতাও হলুদ রঙ ধারণ করে। পরবতীতে পাতা বোটার কাছে ভেঙ্গে গাছের চতুর্দিকে ঝুলে থাকে এবং মরে যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কচি পাতাটি গাছের মাথায় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অবশেষে গাছ মরে যায়। কোন কোন সময় গাছ লম্বালম্বি ভাবে ফেটেও যায়। এ রোগ দমনে নিন্মলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ক) আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। খ) আক্রান্ত গাছের সাকার চারা হিসেবে ব্যবহার না করা। গ) পানামা রোগ প্রতিরোধকারী চাম্পা জাত ব্যবহার করা।

বানচি-টপ ভাইরাস রোগ
এ রোগের আক্রমণে গাছের পাতা গুচ্ছাকারে বের হয়। পাতা আকারে খাটো, অপ্রশস্থ এবং উপরের দিকে খাড়া থাকে। কচি পাতার কিনারা উপরের দিকে বাঁকানো এবং সামান্য হলুদ রঙয়ের হয়। অনেক সময় পাতার মধ্য শিরা ও বোটায় ঘন সবুজ দাগ দেখা যায়। এ রোগে আক্রান্ত গাছে কোন সময় মোঁচা আসেনা। নিন্মোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগ দমন করা যায়। ক) ভাইরাস বহনকারী এফিড পোকা দমনে রগর বা সুমিথিন (২ মি.লি./লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।) খ) আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। গ) বানচি-টপ রোগ প্রতিরোধকারী চাম্পা জাত ব্যবহার করা।

সিগাটোকা রোগ
এ রোগের আক্রমণে প্রাথমিকভাবে ৩য় বা ৪র্থ পাতায় ছোট ছোট হলুদ দাগ দেখা যায়। ক্রমশ দাগগুলো বড় হয় ও বাদামি রং ধারণ করে। এভাবে একাধিক দাগ বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং তখন পাতা পুড়ে যাওয়ার মত দেখায়। নিন্মোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগ দমনে রাখা হবে। ক) আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। খ) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি টিল্ট-২৫০ ইসি অথবা ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর গাছে ছিটাতে হবে।

ফল সংগ্রহঃ
ঋতুভেদে রোপণের ১০-১৩ মাসের মধ্যে সাধারণত সব জাতের কলাই পরিপক্ব হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করলে কলার গায়ের শিরাগুলো তিন-চতুর্থাংশ পুরো হলেই কাটতে হয়। তাছাড়াও কলার অগ্রভাগের পুষ্পাংশ শুকিয়ে গেলে বুঝতে হবে কলা পুষ্ট হয়েছে। সাধারণত মোচা আসার পর ফল পুষ্ট হতে আড়াই থেকে চার মাস সময় লাগে। কলা কাটানোর পর কাদিঁ শক্ত জায়গায় বা মাটিতে রাখলে কলার গায়ে কালো দাগ পড়ে ও কলা পাকার সময় দাগওয়ালা অংশ তাড়াতাড়ি পচে যায় ।

ফলন
রোপণের পর ১১-১৫ মাসের মধ্যেই সাধারণত সব জাতের কলা পরিপক্ক হয়ে থাকে। বাংলাদেশে অমৃত সাগর কলা প্রতি হেক্টরে ১৫-২০ টন এবং মেহের সাগর প্রতি হেক্টরে ২০-২৫ টন ফলন দেয়।

মুড়ি ফসল
চারা রোপণের প্রথম ৪-৫ মাস পর সাকার (ফেকড়ি) বের হওয়া শুরু করে। কলাগাছে থোড় বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ১৫ দিন পরপর মাটির ৫ সে.মি. উপরে ধারালো হাসুয়া দিয়ে সবগুলো চারা কেটে ফেলে দিতে হবে। থোড়া বা ফুল বের হবার পর পছন্দমত জায়গায় কোন একটি চারাকে বাড়তে দেয়া উচিত যেটি মুড়ি ফসল হিসেবে পরবর্তীতে বেড়ে উঠবে ও ফল দিবে। মুড়ি ফসলের জন্য সমান বয়সের চারা নির্বাচন করতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button